Featured
- Get link
- X
- Other Apps
ঘুঙুরের ডাক ও নদীর বউ | চর বালিয়া ইউনিয়নের একটি লোকবিশ্বাসভিত্তিক প্রেম ও আত্মত্যাগের গল্প
ঘুঙুরের ডাক ও নদীর বউ
(একটি নদীঘেরা ইউনিয়নে শতাব্দীপ্রাচীন এক রহস্যময় নারীর করুণ পরিণতি, ভালোবাসা ও প্রতিশোধের অলৌকিক গল্প)
ভূমিকা:
বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের একটি ছোট্ট ইউনিয়ন — চর বালিয়া। এই ইউনিয়নকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে একটি রহস্যময় লোককথা। ‘ধুমধারী নদী’ নামের একটি চঞ্চল, খরস্রোতা নদী বয়ে গেছে এই গ্রাম দিয়ে। কিন্তু শুধু পানি নয়, এই নদী বয়ে এনেছে কান্না, আত্মত্যাগ, প্রেম আর প্রতিশোধের এক ভয়াবহ উপাখ্যান।
গ্রামের মানুষদের বিশ্বাস, পূর্ণিমার রাতে এই নদীর বুকে ঘুঙুর পরা এক নারী নাচে — সে নাকি অর্পিতা, নদীর বউ। এই নারী কার? কেন সে ঘুঙুর পরে নদীতে নাচে? এ কি আত্মা, না প্রেমে পোড়া কোনো অভিশপ্ত রমণী?
এই গল্প একদিকে যেমন প্রেমের, তেমনি বাস্তবের, রক্তের, প্রতারণার, আবার শেষ পর্যন্ত মুক্তির গল্প। চলুন ফিরে যাই ১৮৫৭ সালের এক সন্ধ্যায়...
অধ্যায় ১: অর্পিতার পরিচয়
১৮৫৭ সালের চর বালিয়া তখনও ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। পাশেই রাজনগর জমিদারবাড়ি, আর তারই কন্যা অর্পিতা সেন। অর্পিতা ছিলেন গীতনৃত্যের অপূর্ব প্রতিভা — উচ্চশিক্ষিত, সুন্দরী, আর স্বাধীনচেতা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে একা বসে গান গাইতেন, আর পায়ের ঘুঙুরে ছন্দ তুলতেন।
একদিন মাছ ধরতে এসে নদীর ঘাটে দেখা হয় জয়নাল নামের এক জেলের সঙ্গে। জয়নাল নিরক্ষর, কিন্তু হৃদয়বান। তাঁর চোখে ছিল সরলতা, মুখে ছিল গান।
প্রথম দেখা, তারপর দেখা হতে থাকে বারবার। কখন যে ভালোবাসা গড়ায় — কেউ বুঝতেই পারে না।
অধ্যায় ২: সমাজের চোখে অপরাধ
অর্পিতার পরিবারের জন্য এ প্রেম ছিল লজ্জার, অসম্ভবের। আর জয়নালের পরিবার ভয় পায় জমিদারের প্রতিশোধকে।
অবশেষে অর্পিতা সিদ্ধান্ত নেন — “সমাজ যদি দেয় না, তাহলে নদী আমার সাক্ষী হোক।”
তিনি জয়নালের হাত ধরে পালিয়ে আসেন চর বালিয়ায়। নদীর ঘাটে কাঠ আর বাঁশের ঘর বানিয়ে নতুন জীবনের শুরু। জয়নাল মাছ ধরে আনেন, আর অর্পিতা বিকালে ঘুঙুর পরে নদীর পাড়ে নাচ করেন — জয়নালের একমাত্র দর্শক হয়ে।
অধ্যায় ৩: জমিদার হারুন ও প্রতিহিংসা
অর্পিতার আগের এক প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক ছিলেন — জমিদার হারুন মির্জা। তিনি আগে অর্পিতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু অর্পিতা প্রত্যাখ্যান করেন। সেই ক্ষোভ চেপে রেখেছিলেন। যখন শুনলেন অর্পিতা পালিয়ে গিয়েছে, তাও এক জেলের সাথে — তাঁর অহংকার চূর্ণ হয়।
হারুন মির্জা সেই অপমানের প্রতিশোধ নেন নির্মমভাবে। এক রাতে তাঁর পাঠানো সশস্ত্র লোকেরা জয়নালকে নদীতে ফেলে হত্যা করে। তারপর তার লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।
অধ্যায় ৪: নদীর বউ
অর্পিতা পাগলের মতো হয়ে যান। তিনি তিন দিন তিন রাত নদীর পাড়ে বসে থাকেন। ঘুঙুর পরে নাচেন, কাঁদেন, ডাকেন — “ধুমধারী নদী, তুমি তো আমার ভালোবাসার সাক্ষী। তুমি জয়নালকে ফিরিয়ে দাও।”
শেষ রাতে — পূর্ণিমার আলোয় নদীর ঘাটে, শেষবার ঘুঙুর পরে, পায়ে আলতা দিয়ে, অর্পিতা নদীতে ঝাঁপ দেন।
সকালবেলা নদীর পাড়ে পাওয়া যায় একটি খালি ঘুঙুর, আর রক্তমাখা চুড়ি।
অধ্যায় ৫: অলৌকিকতা শুরু
এরপর প্রতি পূর্ণিমায় শুরু হয় অলৌকিক ঘটনা।
⟶ নদীর বুক থেকে ভেসে আসে ঘুঙুরের আওয়াজ। ⟶ কেউ দেখে কুয়াশার মাঝে এক নারী, পায়ে ঘুঙুর, চোখে জল, নদীর উপর নাচছে। ⟶ কখনো সে কাঁদে, কখনো বলে — “তুমি এসো জয়নাল, আমি পথ চেয়ে আছি।”
বছরের পর বছর গ্রামের মানুষ রাতের বেলা নদীতে যেতে ভয় পায়। কেউ বলে ওটা অর্পিতার আত্মা, কেউ বলে — “সে নদীর বউ হয়ে গেছে।”
অধ্যায় ৬: গ্রাম্য লোকবিশ্বাস ও শাস্তি
ধীরে ধীরে চর বালিয়ার সমাজে গড়ে ওঠে এক নতুন বিশ্বাস। যদি কেউ তার স্ত্রীর প্রতি অবিচার করে, তবে অর্পিতা তার ঘরে ঘুঙুরের ডাক পাঠাবে।
⟶ একবার এক ব্যক্তি নিজের বউকে নির্যাতন করছিল — সে রাতে তার ঘরে টিনের ছাদে ঘুঙুর পড়ার শব্দ হয়। পরদিন সে পাগল হয়ে যায়।
⟶ অন্য একবার, এক বিয়ের রাতে ঘুঙুর বাজতে থাকে, আর বরপক্ষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন সবাই বলে — “এই ছেলে হয়তো কারো প্রেম ভেঙে বিয়ে করছে।”
অধ্যায় ৭: ২০২৪ সালে পুনরায় অনুসন্ধান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসংস্কৃতি বিভাগের ছাত্র ইফতি রহমান আসে গবেষণার জন্য। সে সিদ্ধান্ত নেয় এই লোককথার পেছনের সত্য খুঁজবে।
সে কথা বলে প্রবীণদের সাথে, পায় অর্পিতা ও জয়নালের ঘটনার নথিপত্র — জমিদারের বিরুদ্ধে একটি অপমৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত ছিল, যা পরবর্তীতে চাপা পড়ে।
ড্রোন ক্যামেরা ও হাইপারসেন্সর দিয়ে রাতের বেলা ঘুঙুরের শব্দ রেকর্ড করে — অদ্ভুতভাবে, সেখানে ভেসে আসে “এসো জয়নাল...”
অধ্যায় ৮: অর্পিতার আত্মার মুক্তি
ইফতি নদীর তীরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে — নাম দেয়: “ভালোবাসার ঘুঙুর”। সেখানে বসানো হয় অর্পিতার একটি ঘুঙুর ও আলতার ছাপ। প্রতিদিন সেখানে ভালোবাসার দম্পতিরা এসে মোমবাতি জ্বালায়।
এরপর থেকে নদীতে ঘুঙুরের শব্দ অনেকটা কমে যায়। কেউ কেউ বলে — অর্পিতা এবার শান্তি পেয়েছেন।
উপসংহার: শিক্ষা ও বার্তা
‘চর বালিয়া’ এখন কেবল একটি ইউনিয়ন নয়, এটি একটি স্মৃতি, একটি বার্তা — ভালোবাসা কখনো হারে না, মানুষ হারায়, সমাজ হারায়, কিন্তু ভালোবাসা নদীর মতো — নিজের গতিতে চলতেই থাকে।
এক দেয়ালে লেখা:
“যেখানে ঘুঙুর বাজে, সেখানে কান্না থাকে। যেখানে কান্না থামে, ভালোবাসা শান্তি পায়।”
Popular Posts
কাঁচের ভিতর, ক্যামেরার ফাঁদ — ঢাকার গাড়ির MMS কেলেঙ্কারি
- Get link
- X
- Other Apps
How to Get a Work Visa Without Using an Agent: A Complete Step-by-Step Guide for 2026
- Get link
- X
- Other Apps

Comments
Post a Comment