Featured
- Get link
- X
- Other Apps
কালুপীরের কান্না ও উড়ন্ত কলস | একটি ইউনিয়নের অলৌকিক বিশ্বাস ও সত্য প্রকাশের গল্প
হৃদয় গল্প: কালুপীরের কান্না ও উড়ন্ত কলস
(একটি ইউনিয়নের মাজার কেন্দ্রকে ঘিরে অলৌকিক কল্পপ্রসূত লোকবিশ্বাস, আত্মত্যাগ ও মানবতাবাদের গাঁথা — প্রাচীন বাংলার পটভূমিতে)
ভূমিকা:
কালুপীর সারা বাংলার কেউ নন, তিনি কেবল একটি ক্ষুদ্র ইউনিয়নের এক পরিত্যক্ত মাজারে ঘুমিয়ে থাকা এক সময়ের সাধক। তাঁর জীবনের চারদিকে গড়ে উঠেছে লোককাহিনি, বিশ্বাস, অন্ধবিশ্বাস, এবং সেসবের পেছনে লুকিয়ে থাকা মানুষের কান্না। তাঁর নামেই একটি ইউনিয়নের নাম — কালুপীর ইউনিয়ন।
এই গল্পে আমরা দেখব এক পীরের অলৌকিক ভাবমূর্তি কিভাবে সময়ের সাথে ভয় ও শ্রদ্ধার মাঝামাঝি এক ‘লোকভয়ের’ জন্ম দেয়, কীভাবে একটি উড়ন্ত কলস সেই বিশ্বাসের কেন্দ্রে পরিণত হয়, এবং শেষ পর্যন্ত এক কিশোর কীভাবে সেই রহস্য ভেদ করে ভালোবাসার মর্ম শোনায়।
অধ্যায় ১: পীর সাহেবের আগমন
১৭৬২ সালের কথা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা তখন বরিশাল হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নদীঘেরা এক অঞ্চলের পাড়ে হঠাৎ এক দিন দেখা যায় এক অচেনা মানুষ এসে বটগাছের নিচে তাবু ফেলেছেন। তাঁর মুখে ধুতি, কপালে চন্দনের দাগ, আবার গলায় তসবিহ।
লোকেরা প্রথমে ভয় পায়। তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, উনি কারও ক্ষতি করছেন না, বরং সন্ধ্যার পর জ্বালানো প্রদীপের আলোয় বসে থাকেন ধ্যানমগ্ন হয়ে।
একদিন এক মৃতপ্রায় কিশোরকে তাঁর কাছে আনা হলে, তিনি শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দেন — পরদিন সে কিশোর নাকি হেঁটে চলে বেড়াতে শুরু করে। তখন থেকেই গ্রামের মানুষ তাঁকে ডাকে “কালুপীর” নামে। কারণ তিনি গায়ের রং কালো ছিলেন, আর গায়ে ছিল একটা ধুসর জোব্বা।
অধ্যায় ২: ‘উড়ন্ত কলস’ এর প্রথম আবির্ভাব
পীর সাহেব মারা যান ১৭৮৪ সালে। তাঁকে মাটিচাপা দেওয়া হয় বটগাছের পাশেই। এর কয়েক মাস পর থেকেই শুরু হয় এক আশ্চর্য ঘটনা।
প্রতি শুক্রবার ভোরে গ্রামের উত্তর কোণের নদী থেকে ভেসে আসে একটি কলস, যেটা পীরের কবরের মাথার ঠিক সামনে এসে স্থির হয়। তারপর আবার সূর্য ওঠার আগেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
লোকেরা বলে —
“ওই পীরের আত্মা কলসে উঠে সওয়ার হয়ে আসে, আর গ্রামের দুঃখ শোনে।”
বছরের পর বছর ধরে এই ঘটনা চলতে থাকে।
অধ্যায় ৩: ভয় আর ধর্মীয় বিভাজন
এই কলসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে দুই ভাগ — একদল বলে, এটা পীরের অলৌকিকতা, আরেক দল বলে, “এই তো শিরক! আল্লাহ ছাড়া এমন কিছু হইতে পারে না!”
পীরের ভক্তরা সেখানে ছোট মসজিদ, দানবাক্স, এবং পানির কল বসায়। প্রতি শুক্রবার ‘উড়ন্ত কলস’ দেখার জন্য ভিড় জমে যায় ইউনিয়নের আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে।
কিন্তু আশ্চর্য — কেউই কলসটাকে ছুঁতে পারে না। হাত বাড়ালেই সেটা দূরে সরে যায়। কেউ কেউ বলে, “ওটা নাকি চোখের ধোঁকা।”
অধ্যায় ৪: ফিরোজ – কিশোর অনুসন্ধানকারী
ফিরোজ ছিল কালুপীর ইউনিয়নের এক অনাথ কিশোর। সে বড় হয়েছে মাজারের পাশের চা দোকানের মালিক কাদের চাচার কাছে।
তার জেদ — “এই কলসটা কিভাবে আসে আমি বের করবই।”
সে গভীর রাতে বটগাছের ডালে বসে থাকে। কয়েক সপ্তাহ কোনো কিছু পায় না। হঠাৎ এক ভোরে সে দেখতে পায় —
দূরে গামছা মাথায় এক লোক নদীতে নেমে কিছু একটা ভাসিয়ে দিচ্ছে। একটু পরেই সেই কলস!
অধ্যায় ৫: ধরা পড়ে রহস্য
ফিরোজ ধীরে ধীরে অনুসরণ করে। সে দেখে, স্থানীয় এক মসজিদের মোয়াজ্জিন ও এক পুরোহিত মিলে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে একটা সুপ্ত কলস নদীতে নামায়।
কলসে ছিল গোপনে বসানো চুম্বকীয় বল ও হালকা গ্যাস — যাতে সেটা পানির উপরে ভেসে আসে ও বাতাসে সামান্য দুলে।
তারা এই কাজ করত — যাতে লোকজন ভয় পায়, দান করে, এবং তারা সে অর্থ দিয়ে নিজেদের সমাজে প্রভাব বজায় রাখে।
অধ্যায় ৬: মুখোমুখি সংঘর্ষ ও সত্য প্রকাশ
ফিরোজ সিদ্ধান্ত নেয় — গ্রামের সামনে এই মিথ্যাকে ফাঁস করবে।
শুক্রবার সকালে সে কলস ধরার অভিনয় করে — আর লোকজনের সামনে সেটি তুলে ধরে বলে:
“এটা অলৌকিক না! এটা বানানো, এটা ভয়ের ব্যবসা।”
ভিড় বিভক্ত হয়ে যায়। কেউ বিশ্বাস করে, কেউ ধাক্কা দেয় ফিরোজকে। পীরের কিছু পুরনো ভক্ত কাঁদতে কাঁদতে বলে:
“ওরে পীরসাহেব মরেন নাই, শুধু বিশ্বাস মরছে আজ!”
অধ্যায় ৭: আত্মত্যাগ ও মাজারের নতুন ইতিহাস
সেদিনের পর ফিরোজকে গ্রামের অনেকেই একঘরে করে দেয়। কিন্তু সে থামে না। সে মাজারে বসে শিশুদের পড়ানো শুরু করে, কোরআন শেখায়, পুঁথি পাঠ শেখায় —
কিন্তু সবকিছুর মধ্যে সে বলে যায়:
“পীর সাহেব মিথ্যা নন, কিন্তু তাঁর নামে মানুষ যা বানিয়েছে, সেটা মিথ্যা।”
কিছু বছর পর মাজার থেকে ‘কলসের দর্শন’ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কলসটা তখন রাখা হয় মাটির নিচে — তার উপর তৈরি হয় “সত্যতীর্থ পাঠাগার”।
উপসংহার: সত্যর পীর ও ভবিষ্যতের বিশ্বাস
আজও কালুপীর ইউনিয়নে গেলে দেখা যাবে, একপাশে মাজার, অন্যপাশে ছোট পাঠাগার।
দেওয়ালে লেখা আছে:
“ভয় নয়, সত্যই পীর।”
আর একটি মাটির কলস রাখা আছে কাঁচের ভিতরে। তার পাশে ছোট্ট করে লেখা:
“এই কলস একদিন উড়ত, কিন্তু এখন সে মাটিতে দাঁড়িয়ে সত্য বলে।”
- Get link
- X
- Other Apps
Popular Posts
কাঁচের ভিতর, ক্যামেরার ফাঁদ — ঢাকার গাড়ির MMS কেলেঙ্কারি
- Get link
- X
- Other Apps

Comments
Post a Comment