Featured
- Get link
- X
- Other Apps
শঙ্খনদীর পাড়ে এক বাউল: ইতিহাসের ছায়ায় হারিয়ে যাওয়া এক আধ্যাত্মিক কাহিনি
🕉️ শঙ্খনদীর পাড়ে এক বাউল
(আত্মার খোঁজ, সুরের রসায়ন, আর ইতিহাসের পেছনে চাপা পড়া এক আধ্যাত্মিক মানুষের গল্প)
🪶 ভূমিকা:
বাংলার নদী কেবল জল বহন করে না — ইতিহাস, গান আর কান্নাও বয়ে আনে।
এমনই এক নদী “শঙ্খনদী”, চট্টগ্রামের উপকণ্ঠ দিয়ে প্রবাহিত।
তাঁর পাড়েই এক সময় বাস করতেন এক বাউল — নাম “মাধব শাই”।
যিনি ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে, মানুষের মধ্যে মানুষ খুঁজতেন।
এই গল্প তাঁর — এক লোককবি, এক ভবঘুরে, আর এক আধ্যাত্মিক সুরের সন্ধানির।
অধ্যায় ১: মাধব শাই – জন্ম ও ব্যতিক্রমী শৈশব
১৭৫৫ সাল, ব্রিটিশরা তখনো পুরো বাংলা কব্জা করেনি।
তখন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় এক মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয় মাধব শাই,
যার মুখে সদা হাসি, চোখে প্রশ্ন।
তার মা বলতেন, “এই ছেলে কোনোদিন হাটে বসে চাল বিক্রি করবে না।”
সে নদীর ঘাটে বসে সারা দিন বাঁশি বাজাত।
হিন্দু কৃষকদের কীর্তন শুনত, মুসলিম দরবেশদের গজল গুনগুন করত।
শিশু বয়সেই সে জেনে গিয়েছিল —
"ভিতরে যেটা বাজে, সেটাই মানুষ। বাইরে ধর্ম, জাত, নাম — সবই জামা।"
অধ্যায় ২: এক সন্ধ্যার মোড় ও গুরুদর্শন
এক বর্ষার সন্ধ্যায় ঘাটে বসে মাধব বাঁশি বাজাচ্ছিল।
তখনই হঠাৎ এক দরবেশ ছায়ার মতো এসে দাঁড়ায়।
তিনি ছিলেন একজন উপবন ফকির — নাম তাহের শাহ।
তিনি বলেন:
"তুই মানুষ দেখিস, না দেখিস জামা?"
সেদিন থেকে শুরু মাধব শাইয়ের আধ্যাত্মিক পথচলা।
সে ঘর ছাড়ে, নাম নেয় “শাই” —
যার অর্থ, যার নিজস্ব পরিচয় আর নাই, সে নিজেই পথ।
অধ্যায় ৩: শঙ্খনদীর পাড়ে আশ্রম গড়া
মাধব শাই বাস করতে থাকেন শঙ্খনদীর পাড়ে একটা জীর্ণ কুটিরে।
সেখানে দিনে বসে গান লিখতেন, রাতে নদীর জলে পা ডুবিয়ে সাধনায় থাকতেন।
তিনি বলতেন:
“ধর্মে ভেদ নাই, মনের খোঁজে সব মানুষই পথিক।
কেউ বাইবেল জানে, কেউ গীতা, কেউ কোরআন —
কিন্তু কেউই নিজেকে চেনে না।”
অধ্যায় ৪: তাঁর সঙ্গীত — লোক থেকে লালন
মাধব শাইয়ের গান ছিল সাধনা।
তিনি বাঁশির সুরে মানুষকে কাঁদাতেন।
তাঁর গান গাইতেন:
“নদী বলে, আয় মন ফেরত যা,
দেহের মেলায় মন হারাইলি কা?”
তিনি কোনো লেখা রেখে যাননি, কিন্তু তাঁর গান ছিল মুখে মুখে।
তাঁর সুর পরে পৌঁছায় কুমারখালির লালনের কানে।
অধ্যায় ৫: সংঘাত – ব্রাহ্মণ ও মৌলবির প্রতিবাদ
লোকেরা যখন তাঁর গানে মেতে উঠল, তখন গ্রামের মৌলবি ও মন্দিরের পুরোহিত একত্র হয়।
তারা বলেন — "তুমি হিন্দু না মুসলমান? এমন কথা, এমন সুর সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়।"
মাধব বলেন:
"আমি যদি নিজেকে শুধু হিন্দু বা মুসলমান বলি, তবে তো আমি অন্যদের বেদনা বুঝতে পারব না।"
তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় ব্রিটিশ কোর্টে।
তাঁকে বলা হয় — “বিদ্রোহী, সমাজবিরোধী, ও উন্মাদ”।
অধ্যায় ৬: বন্দিত্ব ও গান হারানোর ভয়
১৭৮৭ সালে তাঁকে ২ মাস কারাবন্দি রাখা হয়।
কিন্তু জেলখানায়ও সে গান লিখে যায়।
এক সহবন্দি বলেন:
“সে রাতে আমাদের গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াত। আমরা বলতাম, তুমি ফেরেশতা, আমাদের অশ্রুর সাথী।”
বের হয়ে এসে তিনি নদীর ঘাটে ফিরে যান, কিন্তু তখন আর কেউ আগের মতো ভিড় করত না।
ভয়, ধর্মের কড়া বাঁধন, সমাজের চোখ তাকে একা করে দেয়।
অধ্যায় ৭: মৃত্যু ও স্মৃতির বাউল
এক সকালে নদীর ধারে তাঁর লাশ পাওয়া যায় —
মুখে মৃদু হাসি, হাতে বাঁশি।
লোকেরা বলে, রাতের শেষ গানটি ছিল:
"আমি মরি নাই গো, আমি ঢেউ হয়ে আছি,
শঙ্খের সুরে বাজে এখনো আমার গাথা।”
উপসংহার: আজো শঙ্খনদীর ঢেউয়ে বাউলের সুর
শঙ্খনদী এখনো বহমান।
তার পাড়ে একটা ছোট মাটির ঢিবি আছে,
যেখানে মানুষ ফুল রেখে আসে, বলে:
“ওইখানেই মাধব শাই ঘুমায়।
সে ধর্ম নয়, মানুষ চিনাত।”
- Get link
- X
- Other Apps
Popular Posts
কাঁচের ভিতর, ক্যামেরার ফাঁদ — ঢাকার গাড়ির MMS কেলেঙ্কারি
- Get link
- X
- Other Apps
Comments
Post a Comment