Featured
- Get link
- X
- Other Apps
ছায়ার নিচে বসে ছিল মেয়েটি
লেখক : মাসুম
ব্লগ : EditorPosts
🌿 ছায়ার নিচে বসে ছিল মেয়েটি
—একটি নীরব প্রেম, আত্মত্যাগ ও সমাজের রূঢ় বাস্তবতা
🟢 অধ্যায় ১: হাটের মোড়ে
সকালবেলা সাতটা। কুয়াশায় ঢাকা গ্রামের পথ, মাঝে মাঝে সাইকেল কিংবা গরুর গাড়ির শব্দ। রাস্তার এক কোণে, ছেঁড়া শাল গায়ে জড়ানো এক মেয়ে বসে থাকে। নাম তার চাঁদনি। প্রতিদিনের মতো আজও হাতে শাকপাতা, কলা, কয়েকটা ডিম নিয়ে বসেছে বিক্রির আশায়।
চাঁদনির চোখে থাকে নির্লিপ্ত একটা তাকানো—সে কারও চোখে চোখ রাখে না, মুখে হাসি নেই, শুধু যেন একটা ছায়া হয়ে বেঁচে আছে।
গ্রামের মোড়ের টঙ দোকানে বসে থাকা যুবক রাজু তাকে প্রতিদিন দেখে। রাজু শহর থেকে মাঝে মাঝে আসে গ্রামের বাড়িতে, মোড়ে আড্ডা দেয়, চা খায়, গল্প করে। চাঁদনিকে সে দেখতে পায়—প্রতিদিন, নিঃশব্দে বসে থাকা একটা মুখ।
একদিন হঠাৎ চা নিয়ে দোকানি বলে, “ওই মেয়েটাকে দেখছো রাজু ভাই, ছায়ার মতো এসে বসে, সন্ধ্যায় চলে যায়। কেউ জানে না ওর গল্প।”
🟢 অধ্যায় ২: অজানা জীবন
চাঁদনির পরিবার বলতে আজ আর কিছু নেই। বাবা-মা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। একমাত্র ভাই রফিক, সে এক দুর্ঘটনায় পঙ্গু। গোটা সংসারের বোঝা একা বইছে চাঁদনি। স্কুলে পড়াশোনা করত, কিন্তু ক্লাস সেভেনেই ছেড়ে দিতে হয়—কারণ সংসার চালাতে হয়।
প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সে মাঠের ধারে শাক কাটে, গাছ থেকে কলা পেড়ে আনে, তারপর হাটে বসে। কারও কাছে সাহায্য চায় না, করুণাও না।
রাজু এসব জানত না। একদিন সে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখে, চাঁদনি বসে বসে ডিম গুনছে, পাশে ভাই রফিক বসে হুইলচেয়ারে। সেই দৃশ্য রাজুর চোখে জল এনে দেয়।
🟢 অধ্যায় ৩: কাছাকাছি আসা
গ্রামে একদিন ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প বসে। রাজু, শহর থেকে কিছু ডাক্তার নিয়ে আসে ক্যাম্পে। লোকজন আসে চেকআপ করতে। হঠাৎ চাঁদনি ভাইকে নিয়ে আসে। রাজু নিজেই তাদের নাম রেজিস্টারে লেখে, ডাক্তার দেখায়।
চাঁদনি একবার ধীরে বলে, “ধন্যবাদ।”
রাজু প্রথমবার চাঁদনির মুখে কথার স্পর্শ পায়। সেইদিন থেকে রাজুর মনে কিছু বদলাতে শুরু করে।
পরদিন সে নিজেই হাটে এসে ছায়া করে দাঁড়ায়, কখনো পানি দেয়, কখনো পাশে বসে। চাঁদনি চুপ করে থাকে, মুখে কিছু বলে না, তবে চোখে হালকা কিছু বদল ঘটে।
🟢 অধ্যায় ৪: গুজব ও সমাজ
গ্রামের লোক চুপ করে থাকতে পারে না। একজন শহরের ছেলে গ্রামের এক গরিব মেয়ের কাছে এভাবে আসছে—লোকজন বলাবলি শুরু করে।
“ছেলেটা নিশ্চয়ই ফাঁদে পড়েছে।”
“মেয়েটা জাদু করেছে নিশ্চয়ই।”
রাজুর বাড়ি থেকে খবর যায় শহরে। মা ফোন করে বলে, “রাজু, ওসব গরিব মেয়েদের থেকে দূরে থাকো। তোমার সামনে অনেক সুন্দর জীবন অপেক্ষা করছে।”
রাজু কিছু বলে না। সে শুধু মনে মনে ভাবে, “এই মেয়েটিই তো মানুষ, বাকিরা তো মুখোশ পরে থাকে।”
🟢 অধ্যায় ৫: প্রেমের পরীক্ষায়
চাঁদনি হঠাৎ একদিন রাজুকে বলে,
“তুমি আর আসো না। এই সমাজ, এই পৃথিবী আমাদের বুঝবে না। তুমি শহরের ছেলে, আমি গাঁয়ের মেয়ে, তাও একা, গরিব। তোমার সাথে আমার কোনো মিল নেই।”
রাজু কাঁপা গলায় বলে,
“আমি তোমার পাশে থাকতে চাই।”
চাঁদনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
“তোমার চাওয়া নিয়ে আমি বাঁচতে পারব না, কিন্তু না চাইতেই তুমি যা দাও, তার বোঝা আমি বইতে পারি না।”
🟢 অধ্যায় ৬: বিদায়ের দিন
একদিন রাজুর বিয়ের খবর আসে—একজন শহরের মেয়ের সাথে এনগেজমেন্ট হয়েছে। চাঁদনি কিছু বলে না। শুধু একদিন হাটে আসে না। পরদিনও না।
রাজু খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, চাঁদনি শহরে চলে গেছে কাজের খোঁজে। ভাইটাকে প্রতিবেশী দেখছে।
রাজু একদিন গ্রামের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দোকানদার তাকে একটা চিরকুট দেয়—চাঁদনির লেখা:
“এই ছায়ার নিচে একটা জীবন ছিল, কেউ বোঝেনি। তবে কেউ একজন ছায়া হয়ে পাশে ছিল, আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। সে আলোয় ফিরে যাক।”
🟢 অধ্যায় ৭: আলো আর ছায়া
রাজু এখন শহরে, চাকরিজীবন, পরিবার, সন্তান। কিন্তু একেকটা সন্ধ্যায় হঠাৎ করে তার চোখে একটা মুখ ভেসে ওঠে—চাঁদনি।
সে আজও ভাবে—একজন মেয়ে, একা, সংসার টেনে নিয়ে যাওয়া, ভালোবাসাকে বিদায় জানানো—এই সাহস ক’জনের থাকে?
চাঁদনির ছায়া আজও রাজুর মনে জ্বলজ্বল করে। আর রাজু চুপ করে মনে মনে বলে—
“তুমি ছায়া ছিলে ঠিকই, কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে সত্য ছিলে তুমি।”
📌 গল্পের শিক্ষা:
এই গল্প কেবল প্রেমের না, এটি আত্মত্যাগের, বাস্তবতার এবং সমাজের রূঢ় অবস্থারও গল্প। চাঁদনির মতো নারীরা আমাদের চারপাশেই আছে, যারা জীবনের কঠিনতম সময়েও মাথা উঁচু করে বাঁচে।
- Get link
- X
- Other Apps
Popular Posts
কাঁচের ভিতর, ক্যামেরার ফাঁদ — ঢাকার গাড়ির MMS কেলেঙ্কারি
- Get link
- X
- Other Apps
Comments
Post a Comment